নিয়মানুবর্তিতা


#

‘বুবকা, পড়তে বসবে এস’। এক ডাকে ব্যাগ নিয়ে ছেলে হাজির। সন্দেহজনক ব্যাপার। একটু পরেই রহস্য ভেদ হল। অবশ্য রহস্য ভেদ না ঘনীভূত বলা মুশকিল। ডাইরি খুলে বলল, 'সই করো।' 'কি করেছিস আবার? ওমা এ তো গার্জেন কল। কি করেছিস?' ' কিচ্ছু না,' ছেলের এক কথা। বকে, ধমকে, অনুনয় করে কোন লাভ হল না। পড়াশোনা মাথায় উঠল। সিদ্ধার্থ কে ধরলাম, 'তুমি যাও, আমার কাল ছুটি নেওয়া মুশকিল।' 'ছুটি নেবে কেন, দেরি করে যাবে'।

'সে তো তুমিও যেতে পারো'।

'না, আমার ফার্স্ট আওয়ারে মিটিং আছে'। মহা বিপদ। নানা ফোনাফুনি করে নির্ঘণ্ট নির্ধারিত হল। বিনিদ্র রজনী কাটিয়ে পরদিন সকালে ছেলেকে নিয়ে স্কুলে চললাম। পথেও জিজ্ঞেস করলাম, 'কি করেছিস, বল না, জানতেই তো পারব'।

' সত্যি কিছু করিনি', ছেলে আমার ভারী ভদ্রলোক, দুরকম কথা বলেন না। 

 ঘন্টা বাজলে ছেলেরা যে যার ক্লাসে চলে গেলে গার্জেন দের ডাক পড়ে। যথাসময়ে ফাদারের ঘরে ঢুকলাম। "ডাক্তার গুপ্ত, আই এ্যম স‍্যরী টু সে, শায়ক দিন দিন খুবই ইনডিসিপ্লিনড্ হয়ে যাচ্ছে”।

মনে মনে বলি, সে আমি হাড়ে হাড়ে জানি।

'আপনি জানেন, ও কি করেছে?'

 মাথা নাড়লাম। 'সে কি, বলে নি? ও কাল জুতো মোজা খুলে খালি পায়ে ক্লাসে ঘুরছিল।‘

এবার আমার অবাক হবার পালা। এই কারণে আমায় ডাকা হয়েছে! এর জন্য সারা সন্ধ্যে ধস্তাধস্তি! সারা রাত ঘুম নেই ! আমি বলেই ফেললাম, 'এটাতো ডায়েরিতে কমপ্লেন হিসেবে লিখে দিলেই হত, আর একটু বকে জুতো মোজা পরে নিতে বলতে পারতেন।'

'তা কি করে বলবো ! ওর জুতো মোজা ভিজে ছিল, তাই ওগুলো খুলে রেখেছিলো।' 

খুব স্বাভাবিক। 'তাহলে তো আমার মতে ও কোন অন্যায় করেনি। ভেজা জুতো পরে থাকলে ঠান্ডা লেগে অসুখ করতে পারত।'

'কিন্তু খালি পায়ে ক্লাসে ঘুরবে কেন নিজের সিটে বসে থাকা উচিত ছিল।'

এবার আমার বেজায় রাগ হল। বললাম, 'দেখুন, আমি তো ওকে জুতো খুলে ক্লাসে ঘুরতে বলিনি। আমাকে ডেকে এসব বলার মানে কি? এসব তুচ্ছ ঘটনা স্পটে ম্যানেজ করে নিলেই তো মিটে যায়।' 'আপনি এটাকে তুচ্ছ ঘটনা বলছেন?' এবার ফাদারের অবাক হবার পালা, 'দেখুন, শুধু স্কুলের শিক্ষায় সবকিছু হয় না, বাড়ির শিক্ষা সমান ইম্পরট্যান্ট। আমি জানি আপনারা দুজনেই ব্যস্ত ডাক্তার, ওকে বিশেষ সময় দিতে পারেন না। এটেনডেন্ট এর কাছে বড় হওয়া বাচ্চারা এইরকম ইনডিসিপ্লিনড্ হয়। আপনারা ওকে আরও সময় দিন।'

শুনছি আর নিজেকে ক্রমাগত মনে মনে বলছি, 'মাথা ঠান্ডা রাখ উত্তর দিও না ।'

অবশেষে অনেক জ্ঞানগর্ভ বাণী শুনে স্কুল থেকে বেরোনো গেল। মেজাজটা এত খারাপ হয়ে গেল যে আর কলেজে গেলাম না। পার্ক সার্কাসে বেঞ্চিতে বসে রইলাম। স্কুল শেষ হলে ছেলেকে নিয়ে একেবারে ফিরব।

 বসে বসে দেখছিলাম বড় বড় গাছের ফোকর দিয়ে কাঠবিড়ালীরা কেমন দৌড়ে আসে, কিভাবে খোলা ভেঙে বাদাম খায়, আবার বাড়িতেও নিয়ে যায়। দেখতে দেখতে মনটা একটু ভালো হলো। তারপর ছুটির পর ছেলেকে পাকড়ালাম, ‘হ‍্যা রে, কাল জুতো মোজা ভিজলো কি করে?’

 'আই জাম্পড্ ইনটু পন্ড'।

'পন্ড! সে আবার এলো কোত্থেকে?’ ও হরি, হঠাৎ বর্ষায় একটা অসম জায়গায় জল জমে ছিল। সেটাই পন্ড। তার মধ্যে লাফানো হচ্ছিল। 'একা একা লাফাচ্ছিলি?'

 'না তো, আমরা টিফিন আওয়ারে স্প্লাশ স্প্লাশ খেলছিলাম’।

‘তা অন্যদের জুতো মোজা ভেজেনি’?

‘'হ্যাঁ, আমাদের সবার জুতো মোজা ভিজে গেছিল। ঋষির তো জামা প্যান্ট ও ভিজে গেছিল’।

 ‘সবাই খালি পায়ে ছিলি’?

‘না, অন‍্যরা  ভেজা জুতো পরে ছিল। ভীতুর ডিম।  আমি আর ঋষি, আমরা দুজন শুধু খুলে রেখেছিলাম’।

‘ঋষির গার্জেন কল হয়েছে’?

'না, ফাদার বোধহয় ওকে দেখতে পায়নি।' সবই আমার কপাল। 'তুমি কলেজ যাওনি, মা?'

' না, আইসক্রিম খাবি?'

ছেলে উজ্জ্বল মুখে হাসল। সেই হাসি দেখে মনটা হঠাৎ করে ভালো হয়ে গেল। হঠাৎ বৃষ্টি যেমন সব নিয়ম ভেঙে আসে, হঠাৎ খুশিও কোন নিয়মের ধার ধারে না। এই যে আজ হঠাৎ ছুটিতে আমার একটা বেশ অন্যরকম দিন প্রাপ্তি হল, এই বা কোন নিয়ম মেনে! মাঝে মাঝে একটু ইনডিসিপ্লিনড্ হলে বোধহয় মন্দ হয় না।